অবৈধ দখল আর বখাটেদের আড্ডায় নষ্ট হচ্ছে বরিশালের চৌমাথা লেক
বরিশাল নগরীর সৌন্দর্যের অন্যতম প্রতীক চৌমাথা লেক এখন অবৈধ দোকানপাট, যানজট, বখাটে আড্ডা ও মাদকসেবীদের দখলে পড়ে কার্যত ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে উঠেছে। দিনের আলো ফুরাতেই সড়ক ও ফুটপাত দখল করে বাণিজ্যিক পসরা সাজানো হয়, আর রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে বিশৃঙ্খলা।
ওয়াকওয়ে দখলে, জিম্মি পথচারী
লেকের চারপাশে নির্মিত ওয়াকওয়েগুলো এখন আর হাঁটার উপযোগী নেই। কারণ, এসব পথজুড়ে গড়ে উঠেছে প্রায় শতাধিক চা, চটপটি, ফাস্টফুড ও অন্যান্য খাবারের দোকান। পাশাপাশি অটোরিকশা, ইজিবাইক ও মাহেন্দ্র স্ট্যান্ডের কারণে পুরো চৌমাথা মোড় এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে চরম যানজট। ফলে পথচারী, যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
এদিকে, লেকপাড় ধরে হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খেতে খেতে বিরক্তি প্রকাশ করছেন বয়স্ক নাগরিকরাও। স্থানীয় বাসিন্দা আবু সাঈদ বলেন, “অবৈধ দোকানপাটের কারণে একটু হাঁটাচলাও করা যায় না। নাগরিক সুবিধা দেখার কি কেউ নেই?”
রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় অবৈধ বাণিজ্য
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের নাম ব্যবহার করে স্থায়ীভাবে অন্তত ৯০টির বেশি দোকান গড়ে উঠেছে। সড়ক প্রশস্তকরণ বা উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হলেই সামনে আসে ‘পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ নয়’ দাবি। সিনিয়র সিটিজেন ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য নাসিম আনোয়ার বলেন, রাজনৈতিক বাধার কারণেই এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না।
রাতে বাড়ে কিশোর গ্যাং ও মাদকের দৌরাত্ম্য
তবে শুধু দোকানপাট নয়, রাত যত গভীর হয় ততই চৌমাথা লেক এলাকায় বাড়তে থাকে কিশোর গ্যাংয়ের দাপট। এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় প্রতিদিনই একাধিক কিশোর গ্রুপ এখানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। মাঝরাত পর্যন্ত চলা এসব আড্ডা থেকে যেকোনো সময় বড় ধরনের অপরাধ ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
লেকের সৌন্দর্য হারিয়েছে বর্জ্যে
একসময় টলটলে পানির ফোয়ারা, পরিচ্ছন্ন ওয়াকওয়ে ও বসার বেঞ্চে ঘেরা চৌমাথা লেক এখন খাবারের উচ্ছিষ্ট, পলিথিন ও ময়লা-আবর্জনায় ঢেকে গেছে। প্রতিদিন রাতে দোকানগুলোর বর্জ্য সরাসরি লেকের পানিতে ফেলা হচ্ছে। ফলে পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য নির্মিত ড্রেনও প্রায় ভরাট হয়ে গেছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, লেকটি লিজ দেওয়ার কারণে এখন সেখানে মাছ চাষ হচ্ছে। এতে মসজিদের মুসল্লিদের অজু ও গোসলের জন্য নির্মিত ঘাটলাও কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
কার দায়িত্বে লেক?
হাতেম আলী কলেজ কর্তৃপক্ষ জানায়, লেকটি কলেজের সম্পত্তি হলেও এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বরিশাল সিটি করপোরেশনের। কলেজের অধ্যক্ষ হারুন অর রশীদ হাওলাদার বলেন, পূর্বের প্রশাসন লেকটি লিজ দিয়ে গেছে, তবে দেখভালের দায়িত্ব বিসিসির।
উচ্ছেদ নিয়ে প্রশাসনের অনিশ্চয়তা
বরিশাল সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ কর্মকর্তা স্বপন কুমার দাস জানান, প্রশাসনের নির্দেশ না পেলে উচ্ছেদ অভিযান চালানো সম্ভব নয়। ফলে সিদ্ধান্তহীনতার সুযোগ নিয়ে অবৈধ দোকানপাট আরও বাড়ছে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
এলাকাবাসীর দাবি
বর্তমানে চৌমাথা লেক ঘিরে অন্তত ৯৬টি অবৈধ দোকান রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সড়ক ও ওয়াকওয়ে মুক্ত রেখে শৃঙ্খলার মধ্যে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ না থাকলে এসব দোকান উচ্ছেদ করা ছাড়া বিকল্প নেই। একইসঙ্গে লেকটিকে সিটি করপোরেশনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এনে কঠোর নজরদারির আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।
সূত্র: দৈনিক আজকের পরিবর্তন






