চকবাজার মোড়ে যেতেই নাকে বিরামহীন সুগন্ধ ছুঁয়ে যায়। বরিশালের এই বিখ্যাত ফকির চাঁন বেকারি চার প্রজন্ম ধরে চলমান। এলাকায় বড় সিনেমা হল থাকায় এক সময় এটি “বিউটি সিনেমা হল লেন” নামেও পরিচিত ছিল। পাশাপাশি, প্রায় ১১০ বছর ধরে এই বেকারি রুটি, বিস্কুট ও কেক তৈরিতে খ্যাতি অর্জন করেছে।
বেকারির প্রধান কারিগর শাহ আলম জানান, তার বাবা হাসান আলী মিস্ত্রীও এখানে কাজ করতেন। তিনি ৮ বছর বয়স থেকে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে শাহ আলম পাউরুটি, মিষ্টি, নোনতা ও টোস্টসহ মোট ১৫ ধরনের বিস্কুট তৈরি করেন। এছাড়া ফ্রুটস, মালটোভা, প্লেইন কেক এবং বিশেষ চানাচুর ও পেস্ট্রি তৈরি করা হয়।
চুলার দৈর্ঘ্য প্রায় ২২ ফুট। সকালে এবং বিকালে চুলার আগুনে প্রতিদিন নতুন বেকারি আইটেম তৈরি হয়। শাহ আলম বলেন, তাঁর বাবা তাঁকে বিস্কুট তৈরির নানা প্রকারের কৌশল শিখিয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ফকির চাঁন মূলত সুগন্ধি ব্যবসায়ী ছিলেন। ভাগ্যের খোঁজে তিনি দিল্লি থেকে ঢাকায় এসেছিলেন এবং পরে বরিশালের দক্ষিণ চকবাজার এলাকায় এই বেকারি স্থাপন করেন। ব্রিটিশ সরকার তিন শতাংশ জমি লিজে দিয়েছিল। ১৯১২ থেকে ১৯১৫ সালের মধ্যে এই প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তখন থেকেই সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।
বর্তমান মালিক আহমদুল্লাহ রাকিব বেকারির ব্যবসা দেখাশোনা করেন। তিনি ঢাকায় থাকেন, তবে প্রতি ১৫ দিনে ব্যবসার তদারকির জন্য বরিশাল আসেন। রাকিব জানান, চার প্রজন্ম আগে ফকির চাঁন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে সরবরাহ করতেন।
শাহ আলম বলেন, “আমাদের সুগন্ধ ও স্বাদে এক নম্বর মান বজায় রাখার কারণ হলো, আমরা সবসময় ভালো উপকরণ ব্যবহার করি। এমনকি বিস্কুট তৈরিতেও ঘি ব্যবহার করা হয়।”
বেকারির কর্মীরা জানান, এখানে ওভালটিন বিস্কুট, সেমাই বিস্কুট, ঢালাই বিস্কুট, কসমস বিস্কুট, বাদামি বিস্কুট, চান টোস্ট, নলি টোস্টসহ প্রায় ৬০ কেজি বিস্কুট প্রতিদিন উৎপাদন হয়। পাশাপাশি ১৫০ পিস রুটি এবং ৪৫ কেজি চানাচুরও তৈরি হয়।
ম্যানেজার তোতা মিয়া ৫০ বছর ধরে কাজ করছেন। তিনি জানান, এখানে কারখানার শ্রমিকসহ ১৮ জন কাজ করছেন এবং কমপক্ষে ১২ ধরনের লাইসেন্সের প্রয়োজন। যদিও খরচ বেশি, তবু মান কমানো হয় না।
রাকিব বলেন, “আমাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের কোনো পরিকল্পনা নেই। শুধুমাত্র আমাদের পূর্বপুরুষের সুনাম ধরে রাখা আমাদের মূল লক্ষ্য।”
ফকির চাঁন বেকারি আজও বরিশালের ইতিহাসের অংশ, যেখানে প্রাচীন গন্ধ, সুস্বাদু বিস্কুট ও রুটি প্রতিদিন মানুষের কাছে পৌঁছায়।