বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের ১২ কিলোমিটার এলাকা এখন বাগদা চিংড়ির রেনু পোনা পাচারের প্রধান রুটে পরিণত হয়েছে।
গত ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই পাচার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে নতুন হাতবদলকারীদের কাছে।
বর্তমানে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের একাংশের বিরুদ্ধে রেনু পাচারের গাড়ি থেকে ‘বিট মানি’ বা চাঁদা নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বরিশাল মহানগর বিএনপির এক শীর্ষ নেতার ছত্রছায়ায় ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এই অবৈধ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন।
এই পাচার চক্রের মূল হোতা হিসেবে উঠে এসেছে গোপালগঞ্জের ‘টুলু’ নামের এক ব্যক্তির নাম।
টুলুর কাছ থেকে নিয়মিত বিট মানি নিয়ে রেনু বহনকারী গাড়িগুলো নির্বিঘ্নে পার করে দিচ্ছে স্থানীয় একটি চক্র।
এই অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার তালিকায় স্থানীয় কিছু পুলিশ সদস্যের নামও শোনা যাচ্ছে।
পাচারের রুট ও যেভাবে চলে নজরদারি
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভোলা, বরগুনা ও পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকা থেকে নদীপথে এই রেনু বরিশালে আনা হয়।
পটুয়াখালীর বাউফলের কালাইয়া লঞ্চঘাট, বাকেরগঞ্জের লেবুখালী ও গোমা ফেরিঘাট, ভোলার লাহারহাট এবং বাবুগঞ্জের মিরগঞ্জসহ বিভিন্ন পয়েন্ট ব্যবহার করে রেনু ট্রাকে তোলা হয়।
এরপর বরিশাল সদর হয়ে খুলনা ও বাগেরহাটে পাচার করা হচ্ছে এসব রেনু পোনা।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক লাইনম্যান জানান, “আমরা ৩-৪ জন মোটরসাইকেল নিয়ে রেনু বোঝাই ট্রাকের সামনে পাইলট হিসেবে থাকি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সমস্যা দেখলে আমরা সিগন্যাল দিয়ে গাড়ির রুট বদলে দিই।
তাছাড়া রাতের বেলা থানাগুলোতে বিট মানি দেওয়া থাকায় রাত ১২টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত রেনুর গাড়ি পার হতে তেমন কোনো সমস্যা হয় না।”
নেপথ্যে যারা জড়িত
অভিযোগ অনুযায়ী, রেনু পাচারের এই ট্রাফকিংয়ে টুলুর সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন মহানগর ছাত্রদলের সাবেক এক নেতা।
এছাড়াও ২৩, ২৪ ও ২৫ নং ওয়ার্ড বিএনপির কিছু নেতাকর্মী, পলাশপুরের ‘পাতিল হারুন’ প্যারারা রোডের বিপ্লব এবং কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশের কয়েকজন মাঝি নদীপথে নিরাপদে রেনু পারাপারে সহযোগিতা করছেন।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, রূপাতলী, আমতলার মোড়, চৌমাথা ও কাশিপুর এলাকা পার করার জন্য নির্দিষ্ট হারে টাকা ভাগ হচ্ছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
দলীয় ব্যবস্থা ও প্রশাসনের কঠোর হুঁশিয়ারি
এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে বিএনপির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করুন। আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমান অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত কোনো নেতাকর্মীকে দলে রাখবেন না।
অপরাধী চিহ্নিত হলে দল থেকে বহিষ্কারসহ কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ (বিএমপি) কমিশনার মো. আশিক সাঈদ এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
তিনি বলেন, বাগদা রেনু পাচারে জড়িত ব্যক্তি রাজনৈতিক দলের হোক কিংবা পুলিশ সদস্য—প্রমাণ সাপেক্ষে সবার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।
রেনু পাচারের যেকোনো তথ্য সরাসরি তাকে জানানোর জন্য অনুরোধ করেছেন পুলিশ কমিশনার।