শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রোতে কর্মরত সহকারী প্রকৌশলী মো. সরোয়ার হোসেনকে ঘিরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, ঠিকাদারি কাজে প্রভাব বিস্তার এবং প্রশাসনিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের ইইডি শাখার আহ্বায়ক কমিটিতে সদস্য হিসেবে থাকা এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি হিসেবে তাঁর পরিচয়ের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি ঢাকা মেট্রোতে কর্মরত থাকায় ১৭ বছরের বঞ্চিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ক্ষুব্ধ। তারা দ্রুত মো. সরোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি জানিয়েছে।
অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের ইইডি শাখার একই কমিটির কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। ফলে একই কমিটিতে থাকা কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে প্রশাসনের সিদ্ধান্তে পার্থক্য কেন—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অভ্যান্তরে।সরোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ, কাজ পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার এবং অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এ বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৭ জুলাই বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর শাখার ১৯ সদস্যবিশিষ্ট একটি আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই কমিটির তালিকার ১৪ নম্বর সদস্য হিসেবে প্রকৌশলী মো. সরোয়ার হোসেনের নাম রয়েছে। সেখানে তাঁর পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে ‘ঢাকা মেট্রোর সহকারী প্রকৌশলী’ হিসেবে।
কমিটি অনুমোদনের নথিতে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মো. নুরুজ্জামানের নাম ও স্বাক্ষর রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সরোয়ার হোসেন ২০২২ সালের জানুয়ারিতে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রোতে যোগ দেন। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের শাখা কমিটি গঠনের সময় তিনি সেখানে কর্মরত ছিলেন।
একজন সরকারি কর্মকর্তার রাজনৈতিক পরিচয় বা কোনো সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রকৃতি, কর্মকর্তার ভূমিকা, প্রযোজ্য সরকারি চাকরিবিধি এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট বিধিভঙ্গের প্রমাণ রয়েছে কি না।
সরোয়ার হোসেনের ক্ষেত্রে এসব বিষয় পর্যালোচনা করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেয়ার দাবি করেছেন সাধারন কর্মকর্তারা। তাঁর নিয়োগ, পদায়ন ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের বিষয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেয়া হলে ক্ষোভ তৈরি হতে পারে বলে সুত্র জানায়।
সরোয়ার হোসেন ঢাকা মেট্রোতে যোগ দেওয়ার সময় নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন হাসান শওকত। পরবর্তী সময়ে ঢাকা মেট্রোর বিভিন্ন কাজ, প্রকল্প ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে নানা অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
সম্প্রতি হাসান শওকতের অফিসকক্ষে অর্থ লেনদেনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে আলোচনায় আসে। ওই ভিডিওকে কেন্দ্র করে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে।
এদিকে, হাসান শওকতের দায়িত্ব পালনকালে ঢাকা মেট্রোর বিভিন্ন উন্নয়নকাজ ও ঠিকাদারি কার্যক্রমে সরোয়ার হোসেনের প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি। তাঁদের অভিযোগ, বিভিন্ন ঠিকাদারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল এবং কাজ পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি প্রভাব বিস্তার করতেন। এ প্রক্রিয়ায় অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বৈষম্য বা অসংগতি রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের ওই আহ্বায়ক কমিটির কয়েকজন সদস্যকে পরবর্তী সময়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে এবং কয়েকজনকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কমিটির ৩ নম্বর সদস্য রায়হান বাদশা, ৪ নম্বর সদস্য আফরোজা বেগম এবং ৫ নম্বর সদস্য সমীর কুমার রজক দাসের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, একই কমিটির ১৪ নম্বর সদস্য সরোয়ার হোসেন এখনো ঢাকা মেট্রোতে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে।
এখানেই দেখা দিয়েছে কয়েকটি প্রশ্ন। একই কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে যদি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কিংবা সাংগঠনিক ভূমিকার কারণে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সরোয়ার হোসেনের ক্ষেত্রে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? আবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রকৃত কারণ যদি ভিন্ন হয়ে থাকে, তাহলে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ভিত্তি কী?
সরোয়ার হোসেনের ঢাকা মেট্রোতে অবস্থান বজায় থাকার পেছনে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রশাসনের ভেতরে প্রভাব কাজ করছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা।নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রধান কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে তিনি ঢাকা মেট্রোতে বহাল রয়েছেন।অভিযোগটি সত্য হলে তা সরকারি প্রতিষ্ঠানে বদলি ও পদায়নের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলতে পারে। তাই তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি বলে মনে করেন কর্মকর্তারা।

সরোয়ার হোসেন কুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ছিলেন । এ ছাড়া ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল এবং সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।তাদের সাথে ছবিও রয়েছে সরোয়ারের।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলন দমন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার এবং বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের হত্যার ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও তদন্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে আদালত ও তদন্তসংশ্লিষ্ট পর্যায়ে বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। আর সেই আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের ঘনিষ্ট হিসেবে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সহকারী প্রকৌশলী মো. সরোয়ার হোসেন।
অন্যদিকে, জাহাঙ্গীর কবির নানকের বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলন দমন ও গুলিবর্ষণের অভিযোগে মামলা ও বিচারপ্রক্রিয়াধীন। সেই জাহাঙ্গীর কবির নানকের ঘনিষ্ঠ লোক হিসেবে পরিচিত সহকারী প্রকৌশলী মো. সরোয়ার হোসেন। সরোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সহিংসতায় উস্কানি ও অর্থ দিয়ে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, দায়িত্ব পালন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ক্ষেত্রেও কর্মকর্তাদের সাংগঠনিক পরিচয় ও পদায়নের বিষয়টি পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।
সরোয়ার হোসেনের ক্ষেত্রে মূলত দুটি বিষয় স্পষ্ট।
প্রথমত, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের ইইডি শাখার কমিটিতে তাঁর অন্তর্ভুক্তির সময় সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী বিধিনিষেধ প্রযোজ্য থাকার পরেও তিনি বিধি বিদান অমান্য করে সংগঠন করেছেন।সংগঠনে ছিল তার জোড়ালো সাংগঠনিক ভূমিকা।
দ্বিতীয়ত, ৫ আগস্টের পরেও তাঁর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও ঠিকাদারি কাজে প্রভাবের কারনে ক্ষুব্ধ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাধারন কর্মকর্তারা।
ঢাকা মেট্রোতে বহাল থাকায় সরকারি গুরুত্বপূর্ণ নথি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ফাঁসের আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই সঙ্গে ঠিকাদারি কাজে প্রভাব বিস্তার ও অর্থের বিনিময়ে প্রশাসনিক সুবিধা পাওয়ার অভিযোগেরও তদন্ত প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রকল্পের নথি, দরপত্র ও কার্যাদেশ, ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগাযোগ, বিল অনুমোদনের প্রক্রিয়া এবং প্রাসঙ্গিক আর্থিক রেকর্ড পর্যালোচনা করারও দাবী জোড়ালো হচ্ছে।
সরোয়ার হোসেনের ঢাকা মেট্রোতে বহাল থাকা এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে তদন্তের পরিধি, সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কিংবা কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না—এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রোতে কর্মরত সহকারী প্রকৌশলী মো. সরোয়ার হোসেনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে অফিসে না পাওয়ায় তার বক্তব্য গ্রহন করা সম্ভব হয়নি।
এখন দেখার বিষয়, প্রধান প্রকৌশলীর আশ্বাসের পর অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয় কি না এবং তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে পদায়ন, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ঠিকাদারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেয়া গুরুত্বপূর্ণ।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের ইইডি শাখার কমিটিতে ছিলেন সহকারী প্রকৌশলী মো. সরোয়ার হোসেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, একই কমিটির কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তিনি এখনো ঢাকা মেট্রোতে কর্মরত। তাঁর বিরুদ্ধে ঠিকাদারি কাজে প্রভাব বিস্তার ও প্রশাসনিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত কতটা এগোয়, এখন সেদিকেই নজর।