নদীর তীরে গেলে মান্তা সম্প্রদায়ের দুঃখের চিত্র দেখা যায়। তাদের জীবনে কোনো শান্তি নেই এবং প্রতিদিন পেটে খাবারও থাকে না। বরিশাল বিভাগে নদীতীরে বসবাসকারী এই মানুষগুলোর প্রধান পেশা হলো মাছ ধরা।
প্রতিবছর ইলিশ ধরায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা এলে তাদের কপালে দুর্ভোগ নেমে আসে। এই নিষেধাজ্ঞার সময়ে মান্তা সম্প্রদায়ের মানুষের ঘরে কোনো চাল জোটে না। বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য কার্যালয় থেকে জানা গেছে মোট জেলের সঠিক সংখ্যা।
চার জেলা মিলিয়ে মোট এক হাজার ৯০৫ জন মান্তা জেলে রয়েছেন। জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় সবাইকে জেলে কার্ডের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। চলতি বছর নিবন্ধিত জেলেদের অনেকেই এখনো পর্যন্ত কার্ড হাতে পাননি আজ।
তবে কার্ড না পেলেও উপজেলা কমিটি থেকে চাল দেওয়ার কথা বলা হয়। সরেজমিনে দেখা গেছে চরম সংকটের মধ্যে দিন যাপন করছেন এই মানুষগুলো। স্থানীয় পর্যায়ে কিছু মান্তা জেলে কার্ড পেলেও সংখ্যাটি খুবই কম ছিল।
প্রকৃত জেলের তুলনায় এই কার্ডের সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশেরও অনেক নিচে নেমে গেছে। বরিশাল জেলার সদর উপজেলার লাহারহাটে এক হাজার মানুষ বসবাস করে সেখানে। এখানকার ১৭৮টি নৌকায় বসবাসকারী মানুষ নানা সমস্যায় দিন কাটাচ্ছেন খুব কষ্টে।
এই পরিবারগুলোর মধ্যে মাত্র ৩৬ জন জেলে কার্ড লাভ করতে পেরেছেন। কার্ড পাওয়া মানুষদের মধ্যে আবার মাত্র নয়জন বরাদ্দকৃত চাল পেয়েছেন তারা। বাকি মানুষগুলো এখনো চাল পাওয়ার আশায় দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করছেন।
তাদের অনেককে চাল নেওয়ার জন্য বিশেষ টোকেন দেওয়া হলেও লাভ হয়নি। লাহারহাটের মান্তা সম্প্রদায়ের সর্দার জসিম সর্দার গণমাধ্যমকে একটি তথ্য জানিয়েছেন আজ। তিনি বলেন নদীতে মাছ ধরা ছাড়া তাদের বেঁচে থাকার পথ নেই।
সবাই জেলে কার্ড পায়নি এবং নিষেধাজ্ঞার সময়ে চালও পান না তারা। তাদের জীবন নিয়ে কেউ কোনোদিন কোনো ধরনের চিন্তাও করে না কখনো। জসিম সর্দার আক্ষেপ করে বলেন তারা এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে পারেন।
১২৫ জনের জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেও কার্ড পেয়েছেন মাত্র ৩৬ জন মানুষ। বারবার আবেদন করার পরেও তারা কোনো ধরনের কার্ড হাতে পান না। বাধ্য হয়ে অনেকে নদীতে মাছ ধরতে যান এবং জেল জরিমানা শোনেন।
মৎস্য বিভাগের অভিযানে মেহেন্দিগঞ্জে বসার ও রাজু নামের দুজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সেই সাথে তাদের মাছ ধরার সব জালও জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। চরবাড়িয়ায় মান্তা সম্প্রদায়ের সর্দার রানা সর্দার একই ধরনের কথা বলেছেন তখন।
তাদের ৪৪টি পরিবারের মধ্যে মাত্র নয়জন জেলে কার্ড হাতে পেয়েছেন এবার। একই সম্প্রদায়ের রাবেয়া বেগম সংবাদকর্মীদের সামনে নিজের কষ্টের কথা জানান আজ। তিনি বলেন তাদের ৪৪টি নৌকায় শতাধিক ছোট ছোট শিশু বসবাস করে।
এই অবুঝ শিশুরা তো সরকারি নিষেধাজ্ঞার কঠিন নিয়মগুলো কখনো বোঝে না। শিশুদের পেটে খাবার তুলে দিতে নৌকা নিয়ে নদীতে নামতে হয় তাদের। নদীতে নামলেই তাদের নানা ধরনের জেল ও জরিমানার মুখোমুখি হতে হয়।
অনেক সময় মৎস্য বিভাগ তাদের যাতায়াতের একমাত্র নৌকাটিও আটকে রাখে সেখানে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমিতির বরিশাল বিভাগীয় সভাপতি ইসরাইল পণ্ডিত কথা বলেছেন। তিনি জানান বরিশাল বিভাগে প্রায় দুই হাজার মান্তা পরিবার বসবাস করে।
এর মধ্যে জেলে কার্ড পাওয়ার সংখ্যা পাঁচশ জনেরও অনেক কম রয়েছে। যাদের প্রধান জীবিকা মাছ ধরা তারা কার্ড না পেলে আইন ভাঙবেন। মান্তা সম্প্রদায়ের প্রতিটি মানুষকে অবিলম্বে জেলে কার্ডের আওতায় আনতে হবে আজ।
মান্তা সম্প্রদায়ের মানুষদের নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইয়ুথনেট কথা বলেছে। সংগঠনের সমন্বয়কারী আরিফুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন এবার। বরিশাল জেলায় চারটি স্থানে মান্তা সম্প্রদায়ের ২৯৫টি পরিবার বসবাস করে সেখানে।
তাদের মধ্যে মাত্র ৮৭ জন জেলে কার্ডের সুবিধা লাভ করতে পেরেছেন। এই সংখ্যাটি মোট পরিবারের সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের চেয়েও অনেক বেশি কম রয়েছে। এই বিষয়ে বরিশাল সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জামাল হোসেন কথা বলেন।
তিনি জানান সদর উপজেলায় পাঁচ থেকে ছয়শ মান্তা জেলে রয়েছেন এখন। চলতি বছর ১৪২ জনসহ মোট দুই শ জন নিবন্ধিত হয়েছেন এখানে। এরা সবাই আগামী বছর নতুন করে কার্ডের সুবিধা হাতে পাবেন নিশ্চিত।
তবে চলতি বছর তারা নিয়ম অনুযায়ী সরকারি চাল পাওয়ার কথা রয়েছে। বিভাগীয় মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী বরিশাল বিভাগে বড় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিন লাখ ৫৮ হাজার ৫১৬ জন নিবন্ধিত জেলের জন্য চাল আছে।
পঁচিশ কেজি করে মোট আট হাজার ৯৬২ মেট্রিক টন চাল দেওয়া হয়। এর মধ্যে বরিশাল জেলায় ৭৯ হাজার ৮৯০ জন জেলের চাল আছে। তাদের জন্য এক হাজার ৯৯৭ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে।
তবে সরেজমিনে দেখা গেছে বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই উপজেলায় দুইশত ত্রিশটি মান্তা পরিবারের মধ্যে একশত নব্বই পরিবার নিবন্ধিত। বাবুগঞ্জ উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা এ এফ এম নাজমুল সালেহ তথ্য দেন।
তিনি জানান এখনো এই উপজেলার চল্লিশটি পরিবার জেলে কার্ড পায়নি আজও। তবে কার্ড না পেলেও সবাইকে সরকারি চাল দেওয়ার কথা জানান তিনি। ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে চলতি মাসে ২২ দিন নিষেধাজ্ঞা চলে।
গত ৮ থেকে ২৯ তারিখ পর্যন্ত সারাদেশে ইলিশ ধরা বন্ধ ছিল। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে মান্তা সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত এই সমস্যা সমাধানের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।