লঞ্চ দুর্ঘটনার সেই ভয়াবহ ও করুণ দৃশ্য পুরো দেশবাসীকে হতবাক করে দিয়েছিল।
দুর্ঘটনার সময় রুবা ছিলেন আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
চোখের সামনে স্বামী ও শ্বশুরকে মরতে দেখা এই অভাগী নারী প্রায় তিন মাস পর গত ৯ জুন এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছেন।
লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিজে অলৌকিকভাবে প্রাণে বাঁচলেও, এখন নবজাতক সন্তান আর সেই দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে এক গভীর অনিশ্চিত জীবন পার করছেন রুবা।
বরিশাল সদর উপজেলার কাশিপুর এলাকার বাসিন্দা নূর আফরিন রুবা। দুর্ঘটনার সময় প্রাণে বাঁচলেও তাঁর হাত ও পা ভেঙে যায় এবং কান কেটে যায়।
পায়ে বড় ধরনের অপারেশন হওয়ায় রুবা এখনো পর্যন্ত সোজা হয়ে হাঁটতে পারছেন না।
ভাঙা হাত ও পায়ের তীব্র যন্ত্রণার কারণে জন্মের পর থেকে এখনো পর্যন্ত তিনি তাঁর কলিজার টুকরো সন্তানকে ঠিকমতো কোলেও নিতে পারেন না।
অর্থের অভাবে বন্ধের পথে ওষুধ ও শিশুর পুষ্টি
যেখানে একটি ফুটফুটে শিশুর জন্ম মানেই পরিবারে আনন্দের বন্যা, সেখানে ছোট্ট শিশু রায়ানের পৃথিবীতে আসার গল্প এখন শুধুই বিষাদ আর হাহাকার।
মূলত, তীব্র অর্থাভাবে শিশুটির প্রয়োজনীয় খাবার, দুধ ও ওষুধ কিছুই জোগাড় করতে পারছেন না এই অসহায় মা।
বর্তমানে তাঁর দিনমজুর বাবা এবং ছোট চাকরিজীবী মায়ের আশ্রয়ে কোনোমতে দিন কাটছে এই ভাঙা পরিবারের।
তবে তাঁদের পক্ষেও এই দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
সরকারি সহায়তা মিললেও মেলেনি লঞ্চ কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুত অর্থ
এদিকে, লঞ্চ দুর্ঘটনার প্রায় তিন মাস পর গত ১৪ জুন সরকার থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৫ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন রুবা।
তবে লঞ্চ মালিকপক্ষের কাছ থেকে প্রতিশ্রুত ক্ষতিপূরণের কোনো অর্থ এখনো তাঁদের হাতে এসে পৌঁছায়নি।
রুবার পরিবারের অভিযোগ লঞ্চ কর্তৃপক্ষ বিআইডব্লিউটিএ-এর কাছে টাকা জমা দিলেও সেই টাকা এখনো ভুক্তভোগী পরিবারের হাতে হস্তান্তর করা হয়নি।
ফলে সরকারি এই অর্থ দিয়ে নিজের চিকিৎসা চালাতেই হিমশিম খাচ্ছেন তিনি।
একটু সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার আকুতি
নিহত সোহেলের স্ত্রী নূর আফরিন রুবার এখন একটাই চিন্তা, তা হলো তাঁর একমাত্র ছেলে রায়ানের ভবিষ্যৎ।
শ্বশুরবাড়ির উপার্জনক্ষম দুই মানুষ (স্বামী ও শ্বশুর) একসাথে মারা যাওয়ায় রুবা এখন সম্পূর্ণ অভিভাবকহীন।
এই অবস্থায় সন্তানকে নিয়ে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার জন্য এবং নিজের পায়ের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে সরকার সমাজ ও দেশবাসীর কাছে একটি যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার আকুতি জানিয়েছেন তিনি।
অন্য দিকে, স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, কেবল সাময়িক আর্থিক সাহায্য নয়, এই অসহায় মায়ের পুনর্বাসন ও নবজাতকের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
মুখরোচক আশ্বাসের আড়ালে যেন এই নির্মম সত্যটি ঢাকা পড়ে না যায়।
মূলত, একটি স্বাধীন ও মানবিক সমাজে রুবার মতো অসহায় নারীদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।
এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানরা এই অসহায় মায়ের কান্নায় সাড়া দেন কি না।
আরও পড়ুন: লঞ্চ দুর্ঘটনার সর্বশেষ তদন্ত প্রতিবেদন, বিআইডব্লিউটিএ-এর ক্ষতিপূরণ ও বরিশালের সব মানবিক খবর