বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে জন্ম নিবন্ধনের ওটিপি জালিয়াতির এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। দীর্ঘ দেড় বছর আগে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও ওটিপি ছিল সাবেক কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণে। এই দীর্ঘ সময়ে ওই ওয়ার্ড থেকে দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষের ভুয়া জন্ম নিবন্ধন করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২৪ শালের আগস্টের পর বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলরদের দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হয়। সে বছরই অক্টোবরে নগর ভবনের কর্মকর্তাদের মাঝে ৩০টি ওয়ার্ডের প্রশাসনিক দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। তখন ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্ব পেয়েছিলেন উপ-সহকারী প্রকৌশলী শফিকুল আলম জামাল নামের এক কর্মকর্তা।
দায়িত্ব পাওয়ার পর শফিকুল আলমের নামেই মূলত জন্ম নিবন্ধনের মূল আইডিটি খোলা হয়েছিল। কিন্তু সেই বছরের ডিসেম্বরেই তৎকালীন সরকার পূর্বের দায়িত্বপ্রাপ্তদের অব্যাহতি দিয়ে নতুন আদেশ জারি করে। এরপর ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন দায়িত্ব পান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শহীদুল ইসলাম।
নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহীদুল ইসলামের নামে সে সময় কোনো নতুন আইডি খোলা হয়নি। নিয়ম ভেঙে আগে দায়িত্বে থাকা শফিকুল আলমের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরেই নিয়মিত ওটিপি পাঠানো হতো। সাবেক কর্মকর্তার কাছ থেকে সেই কোড নিয়ে জন্ম নিবন্ধন সম্পন্ন করতেন ওয়ার্ড সচিব নজরুল ইসলাম।
আর তৈরি করা জন্ম নিবন্ধনের প্রিন্ট কপিতে সরাসরি স্বাক্ষর করতেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম। সম্প্রতি ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান সচিবের চোখে এই জঘন্য অনিয়ম ও জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে। বর্তমান সচিব দেলোয়ার হোসেন এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিত অবহিত করলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
জানা গেছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে শফিকুল আলম সিটি কর্পোরেশনের চাকরি থেকে অবসরে যান। অথচ ২০২৪ সালের মে মাসে ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত ওটিপি তাঁর মোবাইলেই গিয়েছে। এই দেড় বছরে খুলনা, সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলার সহস্রাধিক মানুষের জন্ম নিবন্ধন করা হয়েছে।
বিসিসি ১৪নং ওয়ার্ডের বর্তমান সচিব দেলোয়ার হোসেন বলেন, “আমি ওটিপি পাঠানোর পর স্যারের কাছে গিয়েছিলাম। ওনার নামে আইডি আছে কি না জানতে চাইলে উনি বলেন, নজরুল সাহেব জানেন কীভাবে কী করেছেন। পরে ডিসি অফিসে দেওয়ার পর স্যারের নতুন আইডি হলে আমি কাজ করেছি।”
ডিপিএইচই তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এসএম সহিদুল ইসলাম বলেন, “সচিব যাচাই করে ঠিকমতো দিলে আমি হার্ড কপিতে সই দিই। যেহেতু আমাদের যাচাই করার সময় থাকে না, সেহেতু ও যেটা পাঠিয়ে দিত সেটার ওপরই আমি স্বাক্ষর করেছি।” এছাড়া সচিবের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো কাগজে সই দেননি বলে তিনি জানান।
বরিশালের স্থানীয় সরকার উপ-পরিচালক উপমা ফারিসা বলেন, “বাকি সব ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাগজপত্র আমাদের কাছে আসলেও ওনার কাগজ পাঠানো হয়নি। পরবর্তীতে আমাদের কাছে যখন ওনার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এসেছে, সাথে সাথে আমরা নতুন আইডিটি ক্রিয়েট করে দিয়েছি।”
বিসিসি ১৪নং ওয়ার্ডের সাবেক সচিব নজরুল ইসলাম বলেন, “আইনগতভাবে বলা যায় যে হ্যাঁ, এটা অবশ্যই একটা বড় ভুল।” আপনার কর্মকর্তা কি আপনার কাছে পাসওয়ার্ড চাইলে দিতেন, আরেকজনের গেছে সেটাও দিয়েছেন, মূলত এই হিসেবেই কাজ হয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন।
অবসরপ্রাপ্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী শফিকুল আলম জামাল বলেন, “নজরুল যখন আমাকে বলত স্যার, একটা ওটিপি এসেছে জন্ম নিবন্ধনের জন্য, তখন আমি তাকে ওটিপি দিতাম। এটা সচিবের দায়িত্ব ছিল, কিন্তু সে আমাকে কেন এই জিনিসটা বারবার বলত, তা জানা ছিল না।”
বিসিসির প্রধান নির্বাহী মো. রেজাউল বারী বলেন, “ঘটনা সত্য হলে আমরা আইনগতভাবে যে ব্যবস্থা নেওয়ার, এটা সম্পূর্ণ নিতে পারব। তদন্তের মাধ্যমে এটা আমরা উদ্ঘাটন করব এবং ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে আমরা কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেব না।” অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: বরিশালে জন্ম নিবন্ধন জালিয়াতি চক্রের মূল হোতা গ্রেপ্তার, জালিয়াতির নতুন কৌশল উন্মোচন