বরিশালের বাবুগঞ্জে আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরে লোহালিয়া এলাকায় মানতা শিশুদের জন্য বেদে পাঠশালা খুলেছেন দুই বোন মিতু এবং মুন্নি। স্কুলবিমুখ এই পিছিয়ে পড়া শিশুদের তারা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা দিচ্ছেন। দুই বোন নিজেদের বাড়ির উঠানে অত্যন্ত যত্নের সাথে এই পাঠদানের মহৎ উদ্যোগটি গ্রহণ করেছেন।
এই ব্যতিক্রমী পাঠশালায় এসে এখন অত্যন্ত মনের আনন্দে পড়াশোনা শিখছে লোহালিয়ার মানতা শিশুরা। অথচ পড়াশোনার জন্য তারা যখন আগে সরকারি স্কুলে গিয়েছিল, তখন নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিল। সহপাঠীদের অভিভাবকদের অবহেলার কারণে বেশিরভাগ শিশুই পূর্বের স্কুল থেকে ঝরে পড়েছিল।
ঝরে পড়া শিশুরা জানায়, “স্কুলে গেছিলাম, ওগোর মায়েরা আমাগো কয়, পোলাপাইন আমাগো বেবাইজ্জা বলে।” এমন অপবাদ ও বিড়ম্বনা সইতে না পেরে তারা আর সেখানে পড়তে যায়নি বলে জানায়। তবে বর্তমান পাঠশালা নিয়ে তারা বেশ আনন্দিত।
শিক্ষার্থীরা আরও জানায়, “বৃহস্পতিবার হলে নাচ-গান করায়, কবিতা বলায়, গজল গাওয়ায়।” এছাড়া বিকেলে পড়তে আসা এই পাঠশালাটি তাদের খুব ভালো লাগে এবং তারা সুন্দরভাবে ক-খ পড়তে পারে। সংসারের হাল ধরতে গিয়ে মানতা সম্প্রদায়ের অভিভাবকদের নিজেদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া হয়নি।
তবে বর্তমান সময়ে নিজেদের সন্তানেরা সুন্দরভাবে লেখাপড়া করতে পারায় অভিভাবকরা ভীষণ খুশি হয়েছেন। তারা বলেন, “কোনো পয়সা লাগে না, মুন্নি আপা পোলাপাইন নিয়ে বিনামূল্যে পড়ালেখা করায়।” বাচ্চাদের সুশিক্ষা ও দীক্ষা নিশ্চিত করার জন্য তারা এই পাঠশালা নিয়ে খুবই আশাবাদী।
পিছিয়ে পড়া মানতা শিশুদের বিনামূল্যে পাঠদানের এই অনন্য উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। তারা সাধ্যমতো সহায়তা দিয়ে পাশে থাকার আশ্বাসের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার জোর দাবি জানান। এটি দেশের নিরক্ষরতা মুক্ত করার লক্ষ্যে বড় ভূমিকা রাখবে।
এলাকাবাসী মনে করেন, প্রশাসন যদি এগিয়ে আসে তবে এই অবহেলিত বেদে সন্তানরা সুশিক্ষা লাভ করতে পারবে। বেদে পাঠশালার শিক্ষিকা মিতু আক্তার জানান, এই বিশেষ শিশুদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই পাঠশালাটি খোলা হয়েছে। কিন্তু খোলা আকাশের নিচে হওয়ায় ঝড়-বৃষ্টির দিনে তাদের অনেক সমস্যায় পড়তে হয়।
শিক্ষিকা মুন্নি আক্তার বলেন, “এখানে একটা স্থায়ীভাবে একটা স্কুল দেওয়া গেলে খুব ভালো হতো।” তারা যদি একটি স্থায়ী ঘরে ক্লাস করতে পারতেন, তবে শিশুদের পাঠদান আরও সহজ হতো। বিষয়টি জানার পর বরিশাল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বড় আশ্বাস দিয়েছেন।
বরিশাল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল বলেন, “বর্ষা মৌসুমে শ্রেণী কার্যক্রম ব্যাহত না হওয়ার জন্য ব্যবস্থা করা হবে।” স্কুল আওয়ারের পরে কাছের সরকারি স্কুল ঘরটি ব্যবহার করার সুযোগ করে দেওয়ার কথা জানান তিনি। চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়া এই বেদে স্কুলে বর্তমানে ৪০ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়াশোনা করছে।
আরও পড়ুন: বরিশালে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ, আলো ছড়াচ্ছে পাঠশালা