বরিশাল বিভাগের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর পলেস্তারা খসে খসে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। দেখে মনে হতে পারে একদম প্রাচীন বা জরাজীর্ণ কোনো একটি পুরানো ভবনের মধ্যে রয়েছি। অথচ এটি বরিশাল বিভাগের সাধারণ মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা পাওয়ার একমাত্র ভরসাস্থল।
শুনলে আশ্চর্য হতে হবে, জরাজীর্ণ এই কমিউনিটি ক্লিনিকটি বরিশাল শহরের কাশিপুর এলাকায় অবস্থিত। এখানকার চেয়ার টেবিল সবই প্রায় ভেঙে ব্যবহারের অনুপযোগী অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এ ধরনের ভাঙা ও নোংরা চেয়ারেই প্রতিদিন বাধ্য হয়ে বসতে হচ্ছে অসহায় রোগীদের।
ক্লিনিকের এক কোণে ছোট একটি ভেতরটাতে অত্যন্ত কষ্ট করে বসেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। চিকিৎসকসহ আগত রোগীরা অভিযোগ করেছেন, সামান্য বৃষ্টিতেই চারদিকে হাঁটু সমান পানি জমে। বর্ষাকালে ছাদ থেকে অনবরত পানি পড়ে এবং বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকে সারা মাস।
দুর্ভোগের এই চিত্রটি মূলত বরিশাল নগরীর ইছাঘাটি কমিউনিটি ক্লিনিক কেন্দ্রের বলে জানা গেছে। ওষুধসহ নানা তীব্র সংকটের কারণে চরম ঝুঁকি নিয়েই এখানে কোনোমতে চলছে স্বাস্থ্যসেবা। শুধু ইছাঘাটিই নয়, বিভাগের ১,০০০-এরও বেশি কমিউনিটি ক্লিনিকের একই করুণ দশা।
স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, সেবা নিতে এসে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে তাদের। পুরো চিকিৎসা কেন্দ্র জুড়েই সবসময় বিদ্যুৎ থাকে না এবং চারপাশ নোংরা হয়ে থাকে। ক্লিনিকের সরকারি মূল্যবান ওষুধগুলো দীর্ঘ সময় ধরে ইঁদুরে কেটে নষ্ট করছে বলে জানা গেছে।
সংকটের চরম ও ভয়াবহ রূপ দেখা যায় ঝালকাঠি জেলার ৯৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকেও। প্রায় ২০ বছর আগে বনাঞ্চল ঘেরা নিচু জমিতে এই ক্লিনিকগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। নির্মাণের পর থেকে দীর্ঘ সময়েও আর কোনো ধরনের বড় পুনঃসংস্কার কাজ করা হয়নি।
দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় এই ক্লিনিকগুলো এখন একেকটি ভুতুড়ে বাড়িতে রূপ নিয়েছে। ভবন সংকটের সঙ্গে এখানে নতুন করে যোগ হয়েছে মারাত্মক বিষধর সাপের তীব্র আতঙ্ক। সাপের ভয়ে চিকিৎসকরা মূল ভবনের ভেতরে ঠিকমতো বসতে সাহস পাচ্ছেন না বলে জানান।
ঝালকাঠির সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ হুমায়ূন কবির এই বেহাল দশার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পুনঃসংস্কারণের জন্য লিখিতভাবে জোর আবেদন জানিয়েছি।” এদিকে উপকূলবর্তী বরগুনার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে স্বাস্থ্যসেবার সংকট যেন আরও এক ধাপ এগিয়ে।
সদর উপজেলার খাজুরতলা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি মাসের বেশিরভাগ সময়ই সম্পূর্ণ তালাবদ্ধ অবস্থায় থাকে। নিয়মিত কোনো তদারকি না থাকায় এমন দায়িত্বহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। চারটা পর্যন্ত খোলা থাকার নিয়ম থাকলেও ডাক্তাররা ঠিকমতো ক্লিনিকে আসেন না।
বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মো. আবুল ফাত্তাহ জেলার স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমাদের পুরো জেলাতে ১৩৭টা কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে অনেকগুলোই বেশ জরাজীর্ণ।” তবে কিছু জরাজীর্ণ ক্লিনিক এনজিওদের সহযোগিতায় রেনোভেশন বা মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে।
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ লোকমান হাকিম আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, “সরকারের হয়তো প্ল্যান আছে যে, সেকমো দিয়েও ভবিষ্যতে এটা চালাইতে পারে।” এটি হলে একটি চমৎকার পল্লি ইউনিট তৈরি হবে এবং সেবার মান বাড়বে।
স্বাস্থ্য বিভাগের অফিশিয়াল তথ্যমতে, বরিশাল বিভাগে মোট কমিউনিটি ক্লিনিকের সংখ্যা ১,১১৭টি। যার একটি বড় অংশই বর্তমানে ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে। অথচ সরকারি নথিতে প্রায় সবগুলো ক্লিনিকই কাগজে-কলমে সম্পূর্ণ সচল দেখানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: বরিশালে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় বড় ধস: জনবল ও ওষুধ সংকটে বন্ধের পথে ১০টি ক্লিনিক