বরিশালের ঐতিহ্যবাহী কীর্তনখোলা নদী বর্তমানে তীব্র দখল ও মারাত্মক দূষণে তার পুরনো জৌলুস হারাচ্ছে। নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে চিরতরে হারিয়ে যাবে নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহ। এর ফলে স্থানীয় লাখ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা চরম হুমকির মুখে পড়বে।
কীর্তনখোলা নদীতে দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে নিয়মিত মাছ শিকার করছেন অভিজ্ঞ জেলে শাহীন রারি। একসময় এই নদীতে রিটা ও বাঘাইরসহ হরেক প্রজাতির প্রচুর সুস্বাদু মাছ পাওয়া যেত। তবে দূষণের কারণে বর্তমান সময়ে নদী থেকে সব ধরনের মাছ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
জেলে সোহেল হাওলাদার জানান, দীর্ঘ পাঁচ দিন জাল ফেলার পর অল্প কয়েকটি ইলিশ মিলেছে। নদী-নালার এমন বেহাল অবস্থার কারণে নদীতে এখন মাছ টোটালি বা একদমই পাওয়া যাচ্ছে না। ভরা বর্ষার সিজনেও জালে বোয়াল বা অন্য কোনো বড় মাছ মিলছে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রভাবশালী মহলের কারণে নদী অবলীলায় অল্প অল্প করে দখল হয়ে যাচ্ছে। সরকারি খতিয়ান অনুযায়ী প্রায় ১০০০ একরের বেশি নদী জমি এখন দখলদারদের কবলে রয়েছে। চার হাজারেরও বেশি অবৈধ দখলদারের তালিকায় অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও নামকরা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
বরিশাল জেলা নদী রক্ষা কমিটির সম্মানিত সদস্য রফিকুল আলম এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ১৯৮০ সাল থেকে কীর্তনখোলা নদীটি ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন মহলের দখলের আওতায় চলে যাচ্ছে। প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নদীটি সম্পূর্ণ গ্রাস করতেছে।
অবৈধ দখল উচ্ছেদ প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিএ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড আশার বাণী শুনিয়েছে। তারা বলছে, কীর্তনখোলা নদীকে বাঁচাতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে নানা চমৎকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ জাবেদ ইকবাল এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানিয়েছেন।
জাবেদ ইকবাল জানান, ইতোমধ্যে দুই কিলোমিটার তীর রক্ষা কাজ প্রকল্পের মধ্যে রাখা হয়েছে। তীরে পুনরায় যাতে নতুন করে অবৈধ স্থাপনা তৈরি না হয় সেজন্য ওয়াকওয়ে করা হবে। প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ ওয়াকওয়ে নির্মাণের মাধ্যমে নদীর তীরকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করা সম্ভব হবে।
বরিশাল নদী বন্দর নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মোঃ আসাদুজ্জামান উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে নতুন তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, অনেক দখলদার আবার বিভিন্ন সরকারি সংস্থা থেকে ৯৯ বছরের বৈধ লিজ নিয়েছে। তাই কোনগুলো বৈধ আর কোনগুলো অবৈধ তা বিবেচনা করেই পরবর্তী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া ইউনিয়নের লামছড়ি এলাকার আড়িয়াল খাঁ নদের শাখা থেকে কীর্তনখোলার উৎপত্তি। ঝালকাঠি ও বরিশালের সীমান্তবর্তী এলাকা কালিজিরায় সুগন্ধা নামকরণের মধ্য দিয়ে নদীর গতিপথ শেষ হয়েছে। নদীটির প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করা এখন সমগ্র বরিশালবাসীর প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
আরও পড়ুন: কীর্তনখোলা নদীর নাব্যতা সংকট তীব্র, ডুবোচরের কারণে ব্যাহত হচ্ছে দূরপাল্লার লঞ্চ চলাচল