পটুয়াখালীর উপকূলীয় জনপদে জীবন মানেই অনিশ্চয়তা। কখনো জোয়ার-ভাটা, কখনো ঘূর্ণিঝড়, আবার কখনো লবণাক্ত মাটির সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই। তবে এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেই উপকূলবাসীর জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশেষ গাছ—গোলগাছ। এই গাছের রস থেকেই তৈরি হয় ঐতিহ্যবাহী ও সুস্বাদু গোলের গুড়, যা আজ বদলে দিচ্ছে শত শত পরিবারের জীবনের হিসাব।
প্রথমত, গোলের গুড় উৎপাদনের কাজ শুরু হয় ভোর হওয়ার আগেই। কাঁধে বাঁশের মই নিয়ে গোলগাছিরা হেঁটে যান ম্যানগ্রোভে দাঁড়িয়ে থাকা গোলগাছের কাছে। আগের সন্ধ্যায় ঝুলিয়ে দেওয়া মাটির কলসে সারারাত ধরে ফোঁটা ফোঁটা করে জমে রস। ভোরের আলো ফোটার আগেই সেই রস সংগ্রহ করা হয়, যেন একটি ফোঁটাও নষ্ট না হয়।
এরপর রস নিয়ে যাওয়া হয় চাতালে। সেখানে বড় হাঁড়িতে ঢেলে জ্বাল দেওয়া হয় আগুন। ধীরে ধীরে ঘন হয়ে ওঠে তরল। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে নোনতা-মিষ্টি সুবাস—এটাই জানান দেয়, তৈরি হচ্ছে গোলের গুড়।
অন্যদিকে, গোলের গুড় পুরোপুরি মৌসুমি পণ্য হলেও উপকূলীয় দরিদ্র পরিবারের জন্য এটি বড় ভরসা। সাধারণত শীত মৌসুমে প্রায় তিন মাস রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করা হয়। এই সময়ের আয় দিয়েই অনেক পরিবার বছরের বড় অংশের খরচ চালায়।
নীলগঞ্জ এলাকার উৎপাদক শ্যামল চন্দ্র পাল বলেন, লবণাক্ত জমিতে যেখানে ফসল ফলানো কঠিন, সেখানে গোলগাছই তাদের বাঁচার পথ দেখিয়েছে। পরিশ্রম বেশি হলেও আয় নিশ্চিত থাকায় এই পেশার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
একসময় গোলের গুড় শুধু স্থানীয় হাটেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে বর্তমানে পাইকারদের মাধ্যমে এটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যাচ্ছে। বিশেষ করে শহরের ভোক্তারাও প্রাকৃতিক এই গুড়ের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। ফলে চাহিদার পাশাপাশি দামও বেড়েছে।
বর্তমানে বাজারে কেজিপ্রতি গোলের গুড় বিক্রি হচ্ছে ২৬০ থেকে ২৮০ টাকা দরে। একজন উৎপাদক দিনে গড়ে সাত থেকে আট কেজি গুড় তৈরি করতে পারেন। এতে দৈনিক আয় দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা।
এদিকে, গোলের গুড় উৎপাদনে নারীর অংশগ্রহণও বাড়ছে। কলাপাড়া উপজেলার রেণুকা রানী দাস জানান, স্বামী অসুস্থ হওয়ার পর তিনি এই কাজে যুক্ত হন। গোলের গুড় বিক্রির আয়েই এখন সংসার চলছে এবং মেয়ের পড়াশোনার খরচও মেটানো সম্ভব হচ্ছে।
একই এলাকার অভিজ্ঞ গোলগাছি নিতাই চন্দ্র হালদার বলেন, এই কাজে ধৈর্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলতে না পারলে রস নষ্ট হয়ে যায় এবং ভালো গুড় পাওয়া যায় না।
বর্তমানে পটুয়াখালী জেলায় প্রায় ১০০ হেক্টর এলাকাজুড়ে গোলগাছ রয়েছে। এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত পাঁচ শতাধিক পরিবার। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি সহায়তা পেলে গোলের গুড় উপকূলীয় অর্থনীতির একটি টেকসই ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
পটুয়াখালী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ আমানুল ইসলাম জানান, কলাপাড়ায় গোলের গুড় উৎপাদন সম্প্রসারণে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় ৫০০ কৃষক প্রত্যেকে ২০ শতক জমিতে ২০১টি করে গোলগাছের চারা রোপণ করবেন। তাঁর মতে, আগামী ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যে গোলের গুড় একটি সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য হিসেবে গড়ে উঠবে।
সবশেষে বলা যায়, গোলের গুড় কেবল একটি খাদ্যপণ্য নয়। এটি উপকূলীয় মানুষের শ্রম, ধৈর্য এবং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের প্রতীক। আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই মানুষের হাতে তৈরি এই গুড় আজ পটুয়াখালীর উপকূলজুড়ে সৃষ্টি করছে নতুন সম্ভাবনা।
আরও উপকূলভিত্তিক কৃষি ও জীবনসংগ্রামের গল্প পড়তে ভিজিট করুন
প্রিয় বরিশাল ।