মামুনুর রশীদ নোমানী :টাকা ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না—এমন অভিযোগে তোলপাড় ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলা। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর উপজেলা প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে ঘুস বাণিজ্য, প্রকল্পে গাফিলতি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ঠিকাদাররা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, কোনো প্রকল্পের ওয়ার্ক অর্ডার পেতে হলে ৩ থেকে ৫ শতাংশ ঘুস দিতে হয়। আবার কাজ শেষ হলেও বিল তুলতে দিতে হয় ৫ থেকে ৭ শতাংশ। এমনকি ঠিকাদারদের জামানতের টাকা ফেরত পেতেও ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘুস আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেক ঠিকাদার বাধ্য হয়ে ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজাপুর উপজেলার মডেল মসজিদ থেকে মঠবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ হয়ে নাপিতেরহাট পর্যন্ত দুটি আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৪ কোটি ২৬ লাখ টাকার বেশি। তবে দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও কাজ শুরু হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৌশলীর অবহেলা ও অনীহার কারণেই প্রকল্পটি ঝুলে আছে।
আক্কেল মিয়ার বাজারসংলগ্ন আয়রন ব্রিজ থেকে লোহার পাত ও নাট-বল্টু চুরি হয়ে গেলেও সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই। তিন বছর আগে মাটি পরীক্ষা করা হলেও আজ পর্যন্ত ব্রিজ সংস্কার বা নতুন নির্মাণের বিষয়ে কেউ নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেনি। এতে করে অটোরিকশা ও মালবাহী যান চলাচল মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হাশেমের পুল নামে পরিচিত একটি কালভার্ট ভেঙে নতুন ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, ব্রিজটি এখনো ভালো অবস্থায় রয়েছে এবং অন্তত আরও ২০ বছর ব্যবহারযোগ্য। স্থানীয়দের মতে, এখানে কেবল সংস্কারই যথেষ্ট ছিল।
মোল্লারহাট-শ্রীমন্তকাঠি এবং পিংড়ি ভায়া বলারজোড় হাট সড়কের আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ শেষ হলেও দুই পাশে এপ্রোচ সড়ক না থাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এক কোটি ৪০ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত ব্রিজ দুটি জনদুর্ভোগ কমানোর বদলে উল্টো ভোগান্তি বাড়িয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজাপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আয়রন ও পাকা ব্রিজ নির্মাণে দুই কোটির বেশি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে দেড় বছরে কাজ হয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ। পুরোনো ব্রিজ ভেঙে ফেলে রাখায় বর্ষা মৌসুমে স্কুলগামী শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর ঝালকাঠিতে অনুষ্ঠিত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গণশুনানীতে রাজাপুরের আব্দুল হাকিম হাওলাদার প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে বলা হয়, এলজিইডির নির্মিত ব্রিজের কারণে তার বাড়ির যাতায়াত পথ বন্ধ হয়ে গেছে। আশ্বাস দেওয়া হলেও দীর্ঘদিনেও কোনো সমাধান হয়নি।
দুদক শুনানীতে প্রকৌশলীকে ডাকা হলেও রহস্যজনকভাবে তিনি রেহাই পান বলে অভিযোগ রয়েছে। উল্টো অভিযোগকারীকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এলজিইডি অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের টিএ বিল নিজের ব্যাংক হিসাবে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে। পরে বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হলে চাপের মুখে সংশ্লিষ্টদের টাকা ফেরত দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের দাবি, তিনি এখনো আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার পরামর্শেই কাজ করেন। সম্প্রতি একটি খাল খনন কমিটি গঠন করা হয় রাজনৈতিক নেতাদের দিয়ে, যা এলাকায় নতুন করে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। এ নিয়ে মানববন্ধনও হয়েছে
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদার বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। তবে দুদকের গণশুনানীতে আমাকে ডাকা হয়েছিল—এটা সত্য।”
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে যোগদানের পর থেকেই রাজাপুর এলজিইডিতে একের পর এক অভিযোগ উঠলেও এখনো বহাল রয়েছেন অভিজিৎ মজুমদার। ফলে উন্নয়ন নয়, বরং দুর্ভোগই যেন রাজাপুরবাসীর নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।