বরিশাল বিভাগে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও, সারাদেশজুড়ে মাদক সমস্যার ভয়াবহ বাস্তবতা উঠে এসেছে এক জাতীয় গবেষণায়। বিশেষ করে উদ্বেগজনক তথ্য হলো—দেশের মোট মাদক ব্যবহারকারীদের ৬০ শতাংশের বেশি ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রথমবার মাদক গ্রহণ করে।
রোববার রাজধানীর শাহবাগে একটি সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনফারেন্স হলে “বাংলাদেশে মাদক অপব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সংখ্যা, ধরণ ও সংশ্লিষ্ট কারণসমূহ” শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। মানক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণায় অংশ নেয় দেশের আট বিভাগের ১৩ জেলা ও ২৬ উপজেলার ৫ হাজার ২৮০ জন।
গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে আনুমানিক প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের মাদক ব্যবহার করছে। এদের বড় একটি অংশ তরুণ বয়সি। পাশাপাশি কিশোরদের মধ্যেও মাদক গ্রহণের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
এ বিষয়ে প্রধান গবেষক বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডীন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী জানান, দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হলো গাঁজা। এরপর রয়েছে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল এবং কোডিনজাত কাশি সিরাপ।
এদিকে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। ফলে এইচআইভি ও হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। গবেষকেরা বলছেন, এটি এখন একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে।
যদিও শহরাঞ্চলে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেশি, তবে ধীরে ধীরে গ্রামাঞ্চলেও এর বিস্তার বাড়ছে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে ব্যবহারকারী সবচেয়ে বেশি, আর সর্বনিম্ন বরিশাল বিভাগে। তবে সীমান্তবর্তী জেলা ও বড় শহরের আশপাশের এলাকাগুলোকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে কেন মাদক শুরু করছে কিশোররা? গবেষণায় উঠে এসেছে—বন্ধুদের প্রভাবই সবচেয়ে বড় কারণ। পাশাপাশি কৌতূহল, পারিবারিক অশান্তি এবং মানসিক চাপও বড় ভূমিকা রাখছে। অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক পরিবেশ ও সঙ্গদোষে অল্প বয়সেই মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে শিশুরা।
আরও জানা গেছে, মাদকাসক্তদের বড় একটি অংশ কখনোই চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা নেয় না। যারা নেয়, তারাও অনেক সময় ধারাবাহিক ও মানসম্মত সেবা পায় না। ফলে পুনরায় মাদক গ্রহণে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক সমস্যাকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে দেখলে সমাধান সম্ভব নয়। বরং এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তাই প্রতিরোধের পাশাপাশি চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সমাজে পুনঃঅন্তর্ভুক্তির ওপর জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা। একইসঙ্গে কিশোর ও তরুণদের লক্ষ্য করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের আহ্বান জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর-এর মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ। তারা জানান, এই গবেষণার ফল জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত মাদক নিয়ন্ত্রণ নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সবশেষে বলা যায়, বরিশালসহ সারাদেশে মাদক সমস্যার এই চিত্র এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভয়াবহ সংকট ডেকে আনতে পারে।