বরিশাল: শহরের বাজার রোডে দাঁড়িয়ে থাকা এক নীরব ইতিহাসের নাম বলাকা রেস্তরা। বাহারি সাইনবোর্ড নেই, আধুনিক সাজসজ্জাও নয়—তবুও প্রতিদিন শত মানুষের ভিড় জমে এখানে। কারণ, এই রেস্তরার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় ছয় দশকের স্মৃতি ও স্বাদের উত্তরাধিকার।
প্রথমেই ফিরে যাই অতীতে। কালু দাস একসময় কাজ করতেন স্টিমার কোম্পানিতে। তখন ব্রিটিশ দুই কোম্পানি একত্র হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্টিমার ব্যবসাকে ঠেকানোর চেষ্টা করছিল। সেই কোম্পানিগুলোর বাটলার বা শেফের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন কালু দাস।
পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে চাকরি ছেড়ে তিনি বরিশালের বাজার রোডে ছোট্ট একটি রেস্তরা চালু করেন। শুরুটা ছিল খুব সাধারণ। তবে ধীরে ধীরে সকালের নাস্তাকে কেন্দ্র করেই জমে ওঠে আড্ডা।
এখানেই আসে মজার বিষয়। রেস্তরাটির কোনো সাইনবোর্ড ছিল না—আজও নেই। বাজার রোডের বিশিষ্ট ব্যক্তিরাই আড্ডা দিতে দিতে এর নাম দেন “বলাকা”। নামটি কেবল মানুষের মুখে মুখেই ছড়িয়ে পড়ে।
তৎকালীন দো আনির জমিদার মোহাম্মদ আলি শিকদারের জমিতেই শুরু হয়েছিল বলাকার যাত্রা। যদিও প্রায় দুই বছর আগে রেস্তরাটি স্থান পরিবর্তন করেছে।
এদিকে, কালু দাসের হাত ধরে শুরু হওয়া এই রেস্তরার হাল ধরেছেন তাঁর বড় ছেলে উত্তম। প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বলাকাকে আগলে রেখেছেন। ছোট ভাই গৌতম পেশায় স্কুল শিক্ষক হলেও ছুটির দিনে এখনো ওয়েটারের কাজ করেন—এ নিয়ে তাঁর কোনো সংকোচ নেই।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বলাকার অনেক গ্রাহকই কয়েক প্রজন্ম ধরে এখানে নাস্তা করতে আসেন।
তবে প্রশ্ন আসতেই পারে—বলাকায় কী এমন বিশেষ খাবার পাওয়া যায়?
আসলে মেন্যু খুব বড় নয়। কিন্তু উত্তম দার এক হাতে বানানো পরোটা, ভাজার পর বিশেষ কৌশলে “মারধোর” করা সেই পরোটা—স্বাদে আলাদা মাত্রা যোগ করে। সঙ্গে থাকে আগে থেকেই রান্না করা পেঁপে ও ছোলার ডালের তরকারি, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, কখনো বোম্বাই মরিচের কুচি, বিট লবণ আর হালকা কাঁচা ডিমের অমলেট।
সব মিলিয়ে, সাধারণ উপকরণেই তৈরি হয় এক অসাধারণ সকালের নাস্তা।
এদিকে বলাকার বেচাকেনা চলে সকাল সাড়ে সাতটা থেকে এগারোটা পর্যন্ত। এরপর বন্ধ। বিকেলে কয়েক ঘণ্টার জন্য আলুর চপ ও পুরি পাওয়া যায়। তবে সকালে নাস্তা করতে চাইলে কিউতে দাঁড়ানো ছাড়া উপায় নেই।
ফলে বলা যায়, বরিশালে সকালের নাস্তার সেরা ঠিকানাগুলোর একটি বলাকা।
সবশেষে শুধু এটুকুই বলা যায়—স্বাদ আর স্মৃতির মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই বলাকা রেস্তরা টিকে থাকুক আরও কয়েক দশক।
আরও বরিশালভিত্তিক ইতিহাস ও ফিচার পড়তে ভিজিট করুন:
আমাদের বরিশাল আর্কাইভ