বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়কের পাশে পটুয়াখালীর হেতালিয়া বাধঘাট এলাকায় অবস্থিত একটি সাদামাটা টিনসেড ঘর—কিন্তু স্বাদের দিক থেকে রাজকীয়। এই জায়গাটিই পরিচিত জলিল হোটেল নামে। কাঠের পাটাতনের ওপর নির্মিত ঘরে মাটির চুলোয় রান্না করা ঘরোয়া খাবার পরিবেশন করে দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে ভোজনরসিকদের মন জয় করে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি।
শুধু পটুয়াখালী নয়—ঢাকা থেকে কুয়াকাটা যাতায়াতকারী দেশের প্রায় সব জেলার মানুষই কখনো না কখনো এখানে থেমেছেন খাবারের স্বাদ নিতে। ফলে স্থানীয়দের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকেও নিয়মিত আসেন ক্রেতারা।
বিশেষ করে দুপুর হলেই জলিল হোটেলে দেখা যায় সবচেয়ে বেশি ভিড়। প্রবেশ পথের পাশেই মাটির চুলোয় কাঠ জ্বালিয়ে রান্না হচ্ছে চিংড়ি ভুনা, ডাল খাসি ও মুরগির মাংস। অন্যদিকে টেবিল-চেয়ারে বসে আনন্দের সাথে খাচ্ছেন অতিথিরা। জায়গা না পেয়ে অনেকেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন।
এদিকে কর্মচারীরা এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে খাবার পৌঁছে দিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। মালিক আবদুল জলিল নিজেই হাসিমুখে কাস্টমারদের স্বাগত জানান—যা এই হোটেলের আন্তরিক পরিবেশকে আরও আলাদা করে তোলে।
মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আয়শা সিদ্দিকা জানান, তার দাদা ও বাবাও নিয়মিত এখানে খেতে আসতেন। বর্তমানে পরিবারের সদস্যদের নিয়েই মাঝেমধ্যে আসেন তিনি। বিশেষ করে এখানকার চিংড়ি মাছ তার সবচেয়ে প্রিয়।
অন্যদিকে ক্রেতা দেলোয়ার হোসেন বলেন, মাটির চুলোয় রান্না করায় খাবারের স্বাদ আলাদা লাগে। তার মতে, এখানকার ডাল খাসি সত্যিই অসাধারণ।
এই হোটেলের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ হলো—মাত্র ২০ টাকায় তরকারির সাথে আনলিমিটেড ভাত। বড় গামলায় ভাত পরিবেশন করা হয়, প্রয়োজন মতো নিজেই নিয়ে খান ক্রেতারা। এছাড়াও দুধ-কলাসহ নানা ঐতিহ্যবাহী আইটেম পাওয়া যায় এখানে।
তবে একটি ব্যতিক্রমী নিয়ম রয়েছে—পুরো রমজান মাস হোটেল বন্ধ রাখা হয়। সে সময় গেটে আগেভাগেই নোটিশ টাঙিয়ে দেওয়া হয়।
স্থানীয় বাজার থেকে সংগ্রহ করা তাজা নদী ও সাগরের মাছ, কম মসলা আর গ্রামীণ স্টাইলে রান্নাই এই হোটেলের জনপ্রিয়তার মূল রহস্য। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০০ জন মানুষ এখানে খাবার খান। বর্তমানে ৭ জন কর্মচারী নিরলসভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
এখন বাবার পাশে ব্যবসার হাল ধরেছেন ছেলে রবিউল ইসলাম শাকুর। তিনি বলেন, মানুষের বিশ্বাসই আমাদের মূল পুঁজি। তুলনামূলক কম দামে ভালো খাবার দেওয়ার চেষ্টা করি বলেই সবাই আমাদের ভালোবাসেন।
৭০ বছর বয়সী আবদুল জলিল একসময় দই-চিড়া-মুড়ির ভাসমান দোকান করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। দীর্ঘ সংগ্রামের পর আজ তার এই ছোট্ট হোটেলই হয়ে উঠেছে দক্ষিণাঞ্চলের স্বাদের অন্যতম ঠিকানা।
আরও স্থানীয় খাবারের গল্প পড়তে ভিজিট করুন: প্রিয় বরিশাল