হঠাৎই দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে গেল। অর্থাৎ দারিদ্রসীমার নিচে থাকা মানুষের সংখ্যা ২০% থেকে ৪৩% হয়ে গেছে। ২০১১ সালের জুনে ছিল ৩১.৫ শতাংশ। দ্রুতই কমার পরিসংখ্যান পাচ্ছিলাম। ২০১৮ সালের জুনে ছিল ২১.৮ শতাংশ এবং পরের বছরে ২০১৯ সালের জুনে নেমে এসেছিল ২০ শতাংশে। স্বাধীনতার পরপর ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে এ দেশে প্রায় অর্ধেক মানুষই হতদরিদ্র ছিল। তখন হতদরিদ্রের হার ছিল ৪৮ শতাংশ। আর দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত সাড়ে ৮২ শতাংশ মানুষ। নব্বইয়ের দশকের আগ পর্যন্ত এই পরিস্থিতির খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। নব্বইয়ের দশক থেকে বিভিন্ন সরকারের আমলে নানামুখী দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি নেওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যেতে থাকে। দারিদ্র্য হটানোর নানা কর্মসূচি আরও বেশি গতি পায় ২০০০ সালের পর। ২০১৯ সালের জুনে অতি দারিদ্র্য হার নেমে এসেছিল ১০ শতাংশে।বিশ্বব্যাংকের হিসাবে দৈনিক আয় ১ ডলার ৯০ সেন্ট অর্থাৎ ১৬০ টাকা হলে ওই ব্যক্তিকে দরিদ্র হিসেবে ধরা হয় না। অর্থাৎ দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষের আয় দৈনিক ১৬০ টাকার নিচে নেমে এসেছে। অথচ আমাদের টার্গেট ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ হবে দারিদ্র্যমুক্ত। আবার দেশে এই মহামারি কালেও কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে দ্রুত গতিতে। বৈষম্য বৃদ্ধিই মূল কারণ, তবে অন্য কারণও রয়েছে।
দেশের তৈরি পোশাক খাতের অন্যতম পথিকৃৎ উদ্যোক্তা আনিসুর রহমান সিনহা। ১৯৮৪ সালে ওপেক্স গ্রুপের মাধ্যমে পোশাক কারখানা গড়ে তোলেন তিনি। পাশাপাশি সিনহা টেক্সটাইল গ্রুপের মাধ্যমে স্থাপন করেন পোশাক খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পও। ঢাকা থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে কাঁচপুরে ৪৩ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা তার এ শিল্প উদ্যোগ। বস্ত্র ও পোশাক খাতে এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ উৎপাদন ক্ষেত্র। কাঁচপুরে ওপেক্স অ্যান্ড সিনহা টেক্সটাইল গ্রুপের ম্যানুফ্যাকচারিং কমপ্লেক্সে বর্তমানে কেবল নয়টি ইউনিট সচল আছে। একসময় ওই গ্রুপের কাঁচপুরের ইউনিটগুলোতে ৪৫ হাজারেরও বেশি কর্মী কাজ করলেও বর্তমানে এ সংখ্যা একতৃতীয়াংশের নিচে নেমে এসেছে। এখন শুনছি ওনি ব্যবসা বিক্রি করে দেয়ার চেষ্টা করছেন এবং দেশ ছাড়তে চাইছেন! অথচ গার্মেন্টস খাতে ওনার যথেষ্ট সুনামের কথাই শুনছিলাম। ওপেক্সসহ বহু গার্মেন্টস কোম্পানী হতেই বহু শ্রমিক ছাটাই হয়েছে। দারিদ্র্যতা বৃদ্ধির সাথে এর সম্পর্ক অবশ্যই রয়েছে। আরো বেশ কয়েকটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান সম্পর্কেই নেতিবাচক কথা শুনছি।
আর কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে গার্মেন্টস খাত? সৌখিন মানুষ কি তাদের পোষাকে ব্যয় কমিয়ে আনার অভ্যাস বদলাবে? নাকি সামনের দিনগুলোতে তারা আরো বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে আইটি খাতে। ঘরে থেকে থেকে মানুষতো আইটি নির্ভরতা বাড়িয়ে নিয়েছে। পোষাকের চেয়ে তারা নিশ্চিতভাবেই হাতে থাকা আকর্ষণীয় ডিভাইসে ব্যয় বাড়াবে। এক গার্মেন্টসে দুরবস্থার কারণেই কি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে গেল? যদি গার্মেন্টস ঘুড়ে না দাঁড়ায় তবে কি কোনদিনই পূরণ হবে না দারিদ্র্যমুক্তির স্বপ্ন!
চীনের কি অবস্থা? গত তিন বছরে সবচেয়ে বেশি ২১.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে দেশটির রপ্তানি। অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে আর সাধারণ মানুষের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা প্রকল্প চালু করে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা করেছে চীন। সবকটা পদক্ষেপই হয়তো কাজে দিয়েছে। তাই তো গেল বছরের তৃতীয় প্রান্তিকেই প্রবৃদ্ধি আবারো ৫ শতাংশের কাছাকাছি হয়েছিল। ডিসেম্বরে দেশটির শিল্পখাতের কার্যক্রম রেকর্ড বেড়েছে। ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালের ডিসেম্বরে এ হার বেড়েছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মহামারির এ সময় যখন বিশ্বের প্রায় সব দেশ টালমাটাল অবস্থায় ছিল, তখন শুধু চীনই মাথা উঁচু করেছিল। এ সময় চীনে বিনিয়োগ বেড়েছে। ২০২০ সালে চীনের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৫৩ হাজার ৫শ’ কোটি ডলার। যা ২০১৯ সালের চেয়ে ২৭ শতাংশ বেশি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, লকডাউনের কারণে সারাবিশ্বের মানুষ বাড়ি থেকেই কাজ করায় চীনের ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের বিক্রি এ সময়টায় অনেক বেড়েছে। মানে দাঁড়ালো মানুষের করোনাকালের পালস ঠিকই ধরতে পেরেছে দেশটি।
বাংলাদেশে ব্যাংকগুলোতে তারল্য বেড়েছে বিপুল হারেই। সম্ভবত ব্যবসা মন্দা থাকায় মানুষ ব্যাংকেই রাখা রাখছে। এতেও কোটিপতির সংখ্যা অনেক বেশি দেখাচ্ছে। আমানত বাড়ায় ব্যাংকগুলোও বিনিয়োগে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারা আগ্রাসীভাবেই হয়তো আবাসন খাতে বিনিয়োগ করছে। করোনা পরিস্থিতি বদলালে যখন ব্যবসা করার পরিস্থিতি বদলাবে তখন আবাসন খাতে দীর্ঘ মেয়াদে আটকে থাকা টাকা দেশের অর্থনীতিকেও ভূগাতে পারে। খুবই কঠিন একটি সময়। সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন। খুবই দক্ষ অর্থনীতিবিদদের নিরলস পরিশ্রমই পারবে দেশকে সচল রাখতে। আমাদের বিজ্ঞানী না থাকায়, আইটি খাতে বিদেশ নির্ভরতা আমাদের সংকট থেকে মুক্তি দিবে না। আবার আমাদের ওষুধ খাত, সিমেন্ট খাত আমাদের জন্য সৌভাগ্য নিয়ে আসতে পারে। তবে গার্মেন্টস খাতের বিপুল বিনিয়োগ ও বিপুল কর্মসৃষ্টির বিকল্প কোন কিছুই নেই। তাই বুঝতে পারি না এতো বিপুল মানুষের দারিদ্র্যতা কিভাবে দূর হবে?
মুজিব রহমান এর বাংলা ব্লগ । bangla blog | সামহোয়্যার ইন ব্লগ – বাঁধ ভাঙ্গার আওয়াজ